রেঙ্গুন থেকে নেপাইদো : বার্মিজ রাজনীতির দিনপঞ্জি - BNews Bulleting

বাংলাদেশ, ১২ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই ২০২১

রেঙ্গুন থেকে নেপাইদো : বার্মিজ রাজনীতির দিনপঞ্জি - BNews Bulleting

রেঙ্গুন থেকে নেপাইদো : বার্মিজ রাজনীতির দিনপঞ্জি

প্রকাশ: ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ১২:০৯ : অপরাহ্ণ

রেজওয়ান রেজা : আজকের মিয়ানমার যেটি বৃটিশ কলনিয়াল পিরিয়ডে এবং তারো পূর্ববর্তী সময়ে পরিচিত ছিল বার্মা নামে, সব সময়েই একটি রাজনৈতিক অস্থিরতায় ঘিরে রাখা ভূ খন্ড। সাম্প্রতিক সময়ের এর পট পরিবর্তন এর উপর সজাগ দৃষ্টি রাখা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরী। বার্মার ইতিহাস প্রসিদ্ধ রাজধানী রেঙ্গুন সামরিক জান্তার হাত ধরে নাম পাল্টিয়েছে হছে ইয়াঙ্গুন, কিন্তু তারপরেও থেমে থাকে নাই পরিবর্তনের হাওয়া।

অবশেষে রাজধানীই স্থানান্তরিত হয়েছে নতুন নগর নেপাইদো তে। আর রাজধানী পরিবর্তনের সাথে সাথে বার্মা হয়েছে মিয়ানমার, রাজনীতিতে ঘটেছে একের পর এক কিস্তি মাতের খেলা। আর তাতে আষ্ঠে পৃষ্ঠে জড়িয়ে গিয়েছে একটি নাম “অং সান সুচী” এক সময়ের গনতন্ত্রের মানস কন্যা গনহত্যায় ও কাপেন নি বিন্দু মাত্র হয়ত ক্ষমতাইয় টিকে থাকার জন্যেই, কিন্তু আজ হঠাত সামরিক ক্যুতে তিনি পূনরায় বন্দী। আর মিয়ানমারের রাজনীতির উত্থান পতন নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা।

১৯৪৭ সালঃ বার্মিজ রাজনীতির প্রবাদ পুরুষ এবং জাতির পিতা জেনারেল অং সান, যিনি দীর্ঘদিন লড়াই করেছেন জাপানিজ এবং বৃটিশ কলোনিয়াল শাসনের বিরুদ্ধে তিনি খুন হন ১৯৪৭ সালে, বার্মার স্বাধীনতা লাভের মাত্র কয়েক মাস পূর্বে। আজকের নেতা অং সান সূচী ছিলেন তার এক মাত্র কন্যা যার বয়স ছিল তখন মাত্র ২ বছর।
১৯৪৮ সালঃ মিয়ানমার স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতা কালীন প্রেসিডেন্ট ছিলেন “ইউ নু”

১৯৬২ সালঃ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর জেনারেল নে উইন অভ্যুথান করেন এবং সকল ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। এমনকি ব্যবসা বানিজ্য থেকে সকল কল কারখানার মালিকানা নিয়ে নেন সামরিক জান্তা। নিষিদ্ধ করা হয় সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ড এবং দলকে। আর জান্তার এ সকল কর্সূচীতে মিয়ানমার এক ঘরে হয়ে পরে বিশ্বে। আশির দশকে নে উইন রোহিঙ্গাদের বিদেশী ঘোষনা করে এবং জাতিগত নিধন শুরু করে। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই বার্মিজ আর্মী মুসলিম রোহিঙ্গাদের উপর ভয়াবহ জাতিগত নিধন শুরু করে।

১৯৮৮ সালঃ জেনারেল অং সান এর একমাত্র কন্যা অং সান সুচী ইংল্যান্ড থেকে প্রত্যাবর্তন করেন এবং ন্যাশনাল লীগ অফ ডেমক্রেসি নামক রাজনৈতিক কর্মকান্ড শুরু করেন।গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু হয় এ সময়। আগস্টে সামরিক জান্তা ভয়াবহ ক্রাক ডাউন শুরু করে যার ফলে প্রায় ৫ হাজার মানুষ নিহত হন।
১৯৯০ সালঃ সামরিক জান্তার অত্যাচার অন্তর্জাতিক মহলে তীব্র নিন্দার সম্মুখীন হয়। গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক চাপে সামরিক জান্তা সাধারন নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় এবং অং সান সূচীর ন্যাশনাল লীগ অফ ডেমক্রেসী ভূমি ধ্বস বিজয় অর্জন করেন। কিন্তু সামরিক জান্তা জনরায় মেনে নিতে অস্বীকার করে এবং অং সান সূচীকে গৃহবন্দী করা হয়।

১৯৯৫ সালেঃ অং সান সূচীকে গৃহ বন্দী দশা থেকে মুক্তি দান করা হয় যেটা মিয়ানমারকে আসিয়ান জোটে যোগদানে সহায়তা করে। ১৯৯৭ সালে মিয়ানমার আসিয়ান জোটে অন্তর্ভুক্ত হয়।

২০০০ সালঃ অং সান সুচী পূনরায় গৃহবন্দী হন এবং ইউরোপ চূড়ান্ত অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে যার ফলে মিয়ানমার অর্থনীতিক ভাবে পঙ্গু হয়ে পরে।
২০০২ সালঃ অং সান সূচীকে কিছুদিনের জন্য মুক্তি দান করা হলেও ২০০৩ সালে তার উপর হামলা হয় এবং সূচীর নিরাপত্তার অযুহাতে তাকে পূনরায় আটক করা হয় এবং গনতন্ত্রীপন্থী এন এল ডি এর প্রায় ৭০ জন কর্মীকে খুন হয় জান্তার মদদপুষ্ট ইউনিয়ন সোলিডারিটি এন্ড ডেভলপমেন্ট এসোসিয়েশন যেটা ইউনিয়ন সোলিডারটি এন্ড ডেভলপমেন্ট ্পার্টি হিসেবে রাজনোইতিক দল হিসেবে আ ত্ম প্রকাশ করে।

২০০৬ সালঃ সামরিক জান্তা রাজধানী ইয়াঙ্গুন থেকে নেপাইদোতে স্থানান্তর করে।

২০০৭ সালঃ সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা আন্দোলন শুরু করে। আন্দোলন দমন করতে জান্তা কঠোর হয় এবং প্রায় ডজনখানেক জন আন্দোলনকারী নিহত হন।

২০০৮ সালঃ ঘূর্নিঝর নার্গিসের আঘাতে মিয়ানমারে প্রায় ১০ হাজার মানুষ নিহত হন। এর কিছুদিনের মাঝেই সংবিধান সংশোধনে গনভোট অনুষ্ঠিত হয়।
২০১০ সালঃ সংশোধিত সংবিধানের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সুচীর এন এল ডি নির্বাচন বয়কট করে। এবং এক তরফা নির্বাচনে সামরিক জান্তার ইউ এল ডি পি জয় লাভ করে।এ বছরের শেষের দিকে সূচীকে মুক্তি দান করা হয়।

২০১২ সালঃ আরাকান যা মিয়ানমার এর প্রশাসনিক নাম রাখাইন রাজ্যে বৌদ্ধ রাখাইন এবং সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির উপর গনহত্যা শুরু করে যার ফলে হাজার হাজার উদ্বাস্তু বাংলাদেশে শরনার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়।

২০১৫ সালঃ সাধারন নির্বাচনে সূচী এন এল ডি বিপুল ভোটে জয়লাভ করে।সামরিক জান্তার সাথে ক্ষমতা ভাগা ভাগিতে সূচীকে “স্টেট কাউন্সিলর” হিসেবে পদ অর্জন করেন।

২০১৬ সালঃ রাখাইন রাজ্যে বিদ্রোহ দমনের নামে সূচীর অনুরোধে সামরিক অভিযান শুরু হয় যার ফলে রোহিঙ্গাদের উপর গনহত্যা হয় এবং প্রায় ১০ লক্ষ রোহিঙ্গা শরনার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। হেগ এ অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে সূচী সামরিক বাহিনীর গনহত্যাকে সমর্থন করে মিয়ানমারের কর্মকান্ডকে সমর্থন করেন।
২০২০ সালঃ মিয়ানমারে সাধারন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যাতে সূচীর এন এল ডি বিপুল ভোটে জয়লাভ করে কিন্তু সামরিক মদদপূষ্ট ইউ এল ডি পি নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ করে এবং প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নিকট অভিযোগ দায়ের করে যা নির্বাচন কমিশনার খারিজ করে দেয়।

২০২১ সালঃ ১ ফেব্রয়ারী সামরিক জান্তা ১ বছরের জন্য জরুরী অবস্থা ঘোষনা করে এবং সূচী সহ এন এল ডি এর নেতাদের গ্রেপ্তার করেন। ক্ষমতা জেনারেল মিন অং লাইং শাসন ক্ষমতা গ্রহন করেন। মূলত সূচির দলের বিপুল বিজয় সঙ্গহত হত সোমবারে (১ ফেব্রুয়ারি) সংসদ অধিবেশন শুরু হলে। তাই করোনা প্যান্ডেমিক, আন্তর্জাতিক মহলের টাল মাটাল অবস্থা, রোহিঙ্গা সংকট সব কিছু মিলিয়ে সামরিক জান্তা পূনরায় ক্ষমতা দখলের জন্য লালায়িত হয়েছে তবে সামরিক জান্তার এই অন্যায় ক্ষমতা গ্রহন যে মিয়ান্মার বাঃ তার প্রতিবেশী কার জন্যেই কল্যান নিয়ে আসবে না তা বলাই বাহুল্য।

সকল নিউজ